|

Advertisement
×

১০ হাজারে ৬ লাখ জেতার পর ১০ লাখ হারালেন ফরহাদ

রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ৭১ বার পঠিত

১০ হাজারে ৬ লাখ জেতার পর ১০ লাখ হারালেন ফরহাদ

অনলাইন জুয়ার ফাঁদে তরুণরা, বাড়ছে আর্থিক ক্ষতি ও অর্থ পাচারের ঝুঁকি

প্রথমে কৌতূহল, এরপর অল্প টাকায় বড় লাভের স্বপ্ন। একবার বড় অঙ্কের টাকা জেতার পর সেই লোভ আরও বাড়ে। হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় আবার টাকা বিনিয়োগ—এভাবেই ধীরে ধীরে অনলাইন জুয়ার ফাঁদে আটকে পড়েন রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা ফরহাদ হোসেন (ছদ্মনাম)।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা ফরহাদ ২০২২ সালে এক বন্ধুর কাছ থেকে দেখে অনলাইনে জুয়া খেলা শুরু করেন। প্রথম দিকে ১০০, ২০০ কিংবা ৫০০ টাকা করে খেলতেন। মাঝেমধ্যে জিতলেও বেশিরভাগ সময়ই হারতেন। একদিন ১ হাজার টাকা দিয়ে ৫ হাজার টাকা এবং পরদিন ২ হাজার টাকা দিয়ে ১০ হাজার টাকা পাওয়ার পর তাঁর মধ্যে জেতার নেশা আরও বাড়তে থাকে।

২০২৫ সালে একদিন মাত্র ১০ হাজার টাকা লাগিয়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা জেতেন ফরহাদ। সেই অর্থের অর্ধেক তুলে ধারদেনা পরিশোধের পাশাপাশি একটি মোটরসাইকেল কেনেন। বাকি টাকা দিয়ে আরও লাভের আশায় খেলতে থাকেন। কিন্তু এরপর আর লাভ হয়নি। বরং বাকি ৩ লাখ টাকাও হারিয়ে যায়।

হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় এবার ধার করে আবার খেলতে শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে আরও প্রায় ৬ লাখ টাকা হারান। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ১০ লাখ টাকা হারিয়ে ফেলেন।

ফরহাদের ভাষায়, “এক বন্ধুকে দেখে অনলাইনে জুয়া খেলা শুরু করি। প্রথম দিকে ১০০, ২০০ বা ৫০০ টাকা করে ডিপোজিট করে খেলতাম। বেশিরভাগ সময়ই হারতাম। একদিন ১ হাজার টাকা লাগিয়ে ৫ হাজার টাকা পাই। পরদিন ২ হাজার টাকা লাগিয়ে ১০ হাজার টাকা পাই। এতেই লোভ পেয়ে বসে।”

তিনি বলেন, “গত বছর একদিন ১০ হাজার টাকা লাগিয়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা লাভ হয়। সেই টাকার অর্ধেক তুলে ধারদেনা শোধ করি এবং একটি মোটরসাইকেল কিনি। এরপর আরও লাভের আশায় বাকি টাকা দিয়ে খেলতে থাকি। কিন্তু আর লাভ হয়নি। বরং সেই ৩ লাখ টাকাও শেষ হয়ে যায়। হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় আবার ধার করে খেলি। এভাবে আরও প্রায় ৬ লাখ টাকা হারাই।”

একপর্যায়ে নিজের ভুল বুঝতে পারেন ফরহাদ। পরে অনলাইন জুয়ার আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। তবে তাঁর মতো অনেকেই এখনো এই ফাঁদে আটকে আছেন।

৫০ লাখের বেশি মানুষ আসক্ত

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে অনলাইন জুয়া আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এতে বলা হয়েছে, বর্তমানে ৫০ লাখের বেশি মানুষ অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ে আসক্ত। তাঁদের ৩৮ শতাংশ তরুণ ও যুবক।

সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০২৭ সাল নাগাদ অনলাইন জুয়ায় আসক্ত মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।

জুয়া শুধু ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ঋণগ্রস্ততা, পারিবারিক অস্থিরতা এবং অর্থ পাচারের মতো অপরাধও।

চার ধাপে বিদেশে যায় জুয়ার টাকা

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন জুয়ার টাকা চার ধাপে হাতবদল হয়ে বিদেশে পাচার হয়। প্রথম ধাপে থাকে জুয়াড়ি, এরপর স্থানীয় এজেন্ট, সুপার এজেন্ট এবং সবশেষে থাকে মূল হোতা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেখে কিংবা পরিচিতদের মাধ্যমে অনেকেই অনলাইন জুয়ায় যুক্ত হন। বিভিন্ন অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে সাধারণত স্লট, ফিশিং ও লাইভ ক্যাসিনোর মতো জুয়ার ব্যবস্থা থাকে।

খেলা শুরুর আগে জুয়ার অ্যাকাউন্টে অর্থ বা ‘বেট মানি’ জমা দিতে হয়। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে এসব অর্থ পাঠানো হয়। জুয়াড়ি জিতলে একই ব্যবস্থায় টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে।

জুয়াড়িদের পাঠানো অর্থ প্রথমে স্থানীয় এজেন্টদের এমএফএস অ্যাকাউন্টে জমা হয়। এসব এজেন্ট সাধারণত জুয়ার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই নিয়োগ পান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে নিয়মিত নম্বর পরিবর্তন করেন।

এজেন্টরা টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। স্থানীয় এজেন্টরা জুয়াড়িদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ একত্র করে সুপার এজেন্টদের এমএফএস বা ব্যাংক হিসাবে পাঠান। এর বিনিময়ে তাঁরা শূন্য দশমিক ৪ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পান।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, সুপার এজেন্টরা তুলনামূলকভাবে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ। তারা জুয়ার সাইট পরিচালনার পাশাপাশি ডিজিটাল হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাচারে যুক্ত থাকে। এরপর সেই অর্থ পৌঁছে যায় অনলাইন জুয়ার মূল হোতাদের কাছে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, চার ধাপে অনলাইন জুয়ার টাকা বিদেশে পাচার করা হয়। স্থানীয় এজেন্টরা কমিশনের বিনিময়ে এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেন। তাঁদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার নিয়মিত কাজ করছে।

গ্রেপ্তার হচ্ছে এজেন্ট, ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। তাঁদের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ সোমবার রাজধানীর রামপুরা থেকে সজীব দে (৩৭) ও মো. মাসুদ রানা (৩০) নামে দুই এজেন্টকে গ্রেপ্তার করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার।

অন্যদিকে গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ পাস হওয়ার পর এ আইনে ১১টি মামলায় ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ-দক্ষিণ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ১২ জন চীনা নাগরিক রয়েছেন।

তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অধিকাংশই স্থানীয় এজেন্ট বা সুপার এজেন্ট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মূল হোতারা দেশের বাইরে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করায় তাঁদের গ্রেপ্তার করা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের শনাক্ত করাও সম্ভব হয় না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, চীন, রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব জুয়ার সাইট বা অ্যাপ পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে।

ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (দক্ষিণ) কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, অনলাইন জুয়া সাইবার অপরাধের একটি ধরন। ভার্চুয়াল জগতে সংঘটিত হওয়ায় বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে এটি পরিচালনা বা এতে অংশ নেওয়া সম্ভব।

তাঁর মতে, অল্প টাকা বিনিয়োগ করে দ্রুত অনেক টাকা আয়ের সুযোগ রয়েছে—এমন ধারণাই অনেককে অনলাইন জুয়ার প্রতি আকৃষ্ট করছে। ধীরে ধীরে এটি আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

৬৮ মিলিয়ন ডলারের বাজার

জিইডির সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বাজারের আকার প্রায় ৬২ থেকে ৬৮ মিলিয়ন ডলার। প্রতিবছর এই বাজার ৪ দশমিক ৭ থেকে ৬ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়ছে।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) চলতি বছরের ১৫ জুলাই প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ৬ হাজার ২২২টি ব্যাংক ও এমএফএস হিসাবে মোট ৬ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা জমা হয়েছে। একই সময়ে এসব হিসাব থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা।

এই সময়ে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ১ হাজার ৮৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (এসটিআর) ও সন্দেহজনক কার্যক্রম প্রতিবেদন (এসএআর) পেয়েছে বিএফআইইউ।

বছরভিত্তিক হিসাবে ২০২০ সালে এমন প্রতিবেদনের সংখ্যা ছিল ৫০টি। ২০২১ সালে তা বেড়ে ১০৮টি, ২০২২ সালে ২২৭টি, ২০২৩ সালে ৪৬৮টি এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ৪৬টিতে পৌঁছায়।

এ ছাড়া চলতি বছর অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ৭৩৪টি এমএফএস ও ২২৪টি ব্যাংক হিসাব স্থগিত করতে বিএফআইইউকে অনুরোধ করেছে সিআইডি। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, এসব হিসাব থেকে ৪৯ লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে।

একই সময়ে অনলাইন জুয়ার ৭৬৩টি ওয়েবসাইট ও অ্যাপ শনাক্ত করে সেগুলো বন্ধ করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে অনুরোধ জানিয়েছে সিআইডি।

শুধু অর্থ নয়, ঝুঁকিতে পরিবারও

অনলাইন জুয়ার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়ছে পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের ওপরও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তাওহীদুল হক বলেন, জুয়ার টাকা জোগাড় করতে তরুণদের কেউ কেউ চুরি করছেন, মূল্যবান জিনিসপত্র বিক্রি করছেন, এমনকি পরিবারের সদস্যদের অজান্তে তাঁদের অর্থও ব্যবহার করছেন।

তাঁর মতে, এমন ঘটনাও রয়েছে যেখানে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বেতন পাওয়ার পর পুরো অর্থ জুয়ায় খরচ করে ফেলছেন। পরে আবার ধার করে খেলছেন। এতে পরিবারে আর্থিক সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক শান্তি ও সম্পর্কও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

তিনি বলেন, শুধু জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না। অনলাইন জুয়ার পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তাকারীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত জুয়ার সাইট ও অ্যাপের মূল হোতাদের শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

ফরহাদের অভিজ্ঞতা দেখায়, অনলাইন জুয়ার শুরুটা অনেক সময় সামান্য অর্থ ও কৌতূহল থেকে হলেও এর পরিণতি হতে পারে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি। একবার বড় অঙ্কের জেতা যেমন খেলোয়াড়কে আরও বেশি ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করে, তেমনি হারানো অর্থ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা তাকে আরও গভীরে ঠেলে দিতে পারে।

Facebook Comments Box
✎ মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Posted ০১:১৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com